বস্তির মেয়ে পারুলীর কোটি টাকার বাড়ি

তিনি পরিচিত ‘বড় আপা’ হিসেবে। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা টঙ্গীর এরশাদনগরের বস্তিতে। এখনও থাকেন সেখানেই, তবে কোটি টাকায় গড়া নিজ বাড়িতে। বিভিন্ন স্থানে জমি, ফ্ল্যাটসহ আছে আরও অন্তত পাঁচ কোটি টাকার সম্পদ। এমন বিলাসবহুল জীবনের পেছনে জাদুরকাঠি হলো মাদকের কারবার। আত্মীয়-স্বজনকে নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন একটি চক্র। অপকর্মে কেউ বাধা দিলে ধরে এনে পেটানো হয় টর্চার সেলে। এই বড় আপা হলেন পারুলী বেগম।

স্থানীয়রা জানান, পারুলীর মাদক কারবারের কৌশল একটু ভিন্ন। আত্মীয়-স্বজনকে চা-বিস্কুটের দোকান করে দিয়েছেন। দোকানগুলোয় তাঁরা ইয়াবা ও গাঁজার ব্যবসা চালান। কেউ কেউ এলাকায় ঘুরে ইয়াবা বিক্রি করেন। নেপথ্যে থেকে পারুলী সব ঝড়ঝাপটা সামাল দেন। এলাকায় তিনি মাদকের ডিলার। ভাতিজি জামাই ফারুক হোসেন তাঁর ডানহাত।

এরশাদনগর এলাকার ১ নম্বর ব্লকের বাসিন্দা বাদশা মিয়ার মেয়ে পারুলী। অভাব-অনটনে শৈশব ও কৈশোর পার করেছেন। একপর্যায়ে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন মাদকের সঙ্গে। বস্তির এই মেয়ে ধীরে ধীরে হয়ে ওঠেন ভয়ংকর কারবারি। নামে-বেনামে কিনেছেন জমি ও বাড়ি। এরশাদনগরেই আছে তাঁর ৩টি বাড়ি।

বেড়িবাঁধের পাশে কোটি টাকা মূল্যের জমিতে গড়েছেন মুরগির খামার। খাপাড়া এলাকায় আছে আনুমানিক দেড় কোটি টাকা দামের বাড়ি, কিনেছেন ৫ কাঠা জমি। হোসেন মার্কেট ফ্রেন্ডস অ্যান্ড ফ্যামিলি বিল্ডিং-এ ২টি ফ্ল্যাট ছিল। সেগুলোর একটি বিক্রি করেছেন। গাছা এলাকায় আছে দুটি প্লট।
এলাকায় মাদকসম্রাজ্ঞী হিসেবেও পরিচিতি আছে ৩৫ বছর বয়সী পারুলীর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে ভালো সাজার জন্য বছর তিনেক আগে স্বেচ্ছায় মাদক ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে স্বাভাবিক জীবন-যাপন করবেন বলে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন ওই পত্রে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, এক দিনের জন্যও থামেনি তাঁর অপতৎপরতা। প্রয়োজনে তিনি ধারণ করেন অগ্নিমূর্তি। সম্প্রতি কামাল হোসেন নামে এক যুবককে ধরে এনে নিজে মাটিতে ফেলে পিটিয়েছেন। সেই ভিডিও ভাইরাল হয়েছে ফেসবুকে। অবশ্য পারুলীর দাবি, কামাল তাঁর বাড়িতে চুরি করতে এসেছিলেন বলে মারধর করেছেন।

পারুলী বেগম ও তাঁর স্বজনদের নামে বিভিন্ন থানায় দুই ডজনেরও বেশি মামলা আছে। সাত-আটবার গ্রেপ্তার হয়েছেন। জামিনে বেরিয়ে আবার শুরু করেন পুরোনো পেশা। এলাকাবাসীর প্রশ্ন, এত মামলা থাকার পরও তাঁরা কীভাবে অবৈধ ব্যবসা চালিয়ে যান। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার (অপরাধ-দক্ষিণ) মোহাম্মদ ইলতুৎমিশ সমকালকে বলেন, পারুলী বেগমের বিরুদ্ধে শুধু টঙ্গী পূর্ব থানাতেই ১২টির বেশি মামলা রয়েছে। অনেকবার তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর ভাতিজি জামাই ফারুক বলেন, পারুলীর নামে দায়ের করা বেশ কয়েকটি মামলা আদালত থেকে নিষ্পত্তি হয়েছে।

কাজী লাকী নামে টঙ্গীর হোসেন মার্কেট এলাকার এক বাসিন্দা দুর্নীতি দমন কমিশনে পারুলীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কাজী লাকী বলেন, পারুলী এখন কোটি কোটি টাকার মালিক। কোনো চাকরি নেই, ব্যবসা নেই কোথা থেকে তাঁর টাকা আসে? বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দুদকে তিনি অভিযোগ দিয়েছেন। পারুলীর ঘনিষ্ঠ একজন (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) জানান, এরশাদনগরের যে বিশাল বাড়িতে পারুলী থাকেন, সেই বাড়ির প্রধান ফটক তৈরি করতেই লেগেছে ১০ লাখ টাকার বেশি।

স্থানীয়রা জানান, পারুলীর কাছ থেকে মাদক নিয়ে বিক্রি করেন খলিলের স্ত্রী লিপি, ইবরা মিয়ার মেয়ে রিতা, রাজা ও তাঁর স্ত্রী আলো, পিংকি, পারুলীর মামাতো ভাই শাহ্‌? আলম, সালমা আক্তার (মন্টু), আকাশ, হাসি, সোহান, মুন্না, খলিল, জীবন, পারভেজ, আবুল, মোশারফ, মিরাজ, দাইত্তা জলিল, রমজান আলী বাবু, খালেদা ভান্ডারী, আল আমীন, মতি, বিপ্লব, ইবু মিয়া, জামাই লিটন, পুরি মাসুদের ভাগিনা সাজন, জমির, পাতা রুবেল, ফিরোজ, হনুফা, কালুর স্ত্রী স্মৃতি আক্তার, ইউনূস, হারুন, সুমন, আমজাদ, লালু, জাবেদ, জসিম, আকাশ, ভান্ডারী হোসেন, শান্তা মিয়া, নাজু বেগম, তারা গাজী, বিল্লাল, লোকমান, সুমন, আলমগীর, আওলাদের স্ত্রী সাথী, লাইলী, শামসুন্নাহার, হযরত, মইজুদ্দিন, লিটু ও তাঁর ছেলে সোহেল, জুয়েল, হুমায়ুন, সালাম, জামাল ও মাসুদ। তাঁদের অনেকের বিরুদ্ধেই মাদকের মামলা রয়েছে।

পারুলী বেগমের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমকালকে বলেন, ‘২০১৯ সালের ১৯ অক্টোবর আমি আত্মসমর্পণ করেছি। অভাবের তাড়নায় মাদক ব্যবসায় জড়িত হয়ে পড়েছিলাম। মাদকের কুফল সম্পর্কে জানার পর সচেতন হই। গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের কাছে ক্ষমা চেয়ে আবেদন করেছিলাম তখন। এর পর আর মাদকের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হইনি।’ তিনি বলেন, কাজী লাকী নামে এক নারী তাঁর বিরুদ্ধে দুদকে যে অভিযোগ দিয়েছেন তা সত্য নয়। লাকীর সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত বিরোধ আছে। এ কারণে নানা জায়গায় অভিযোগ করছেন। নিজের সম্পত্তি সম্পর্কে পারুলী কিছু বলতে রাজি হননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.