অর্থনীতিতে করোনাভাইরাসের প্রভাব ও করণীয়

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝা যাবে আরো কিছু দিন পর। এখন যে দ্বিতীয় ঢেউ চলছে তা কতদিন ধরে চলবে তা বলা মুশকিল। তবে এর মধ্যে ঘটে যেতে পারে বহুকিছু। এ পরিস্থিতিতে কোন দিকে যাবে আমাদের অর্থনীতি, আগামীতে দেশ কীভাবে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে- এ রকম আরো বহু প্রশ্ন নিয়ে এ মুহুর্তে সকলেই তাকিয়ে আছেন ব্যবসায়ী, গবেষক-অভিজ্ঞজন এবং অর্থনীতিবিদের চিন্তাপ্রসূত কর্মপদ্ধতি কিংবা দিক নির্দেশনার দিকে। সর্বোপরি সরকারের কার্যকর নীতি-নির্ধারণের উপর

করোনাভাইরাসের জন্য বিশ্বজুড়ে গত এক বছর ধরে আতঙ্ক এবং লকডাউনের জন্য সব দেশই এখন অর্থনীতি নিয়ে চিন্তিত। সারাবিশ্ব পর্যটকশূন্য হওয়ায় এয়ারলাইন্স ব্যবসায় ধস নেমেছে। শুধুমাত্র খাদ্যপণ্য ছাড়া অন্য সব ধরনের পণ্য বিক্রি অনেক কমে গেছে। বিভিন্ন দেশে যাতায়াত কিংবা আভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা কমে যাওয়ায় পরিবহন ব্যবসায় লোকসান হচ্ছে। হোটেল ও রেস্টুরেন্ট ব্যবসার অবস্থাও একই রকম। বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ও সেবা খাত বিপর্যস্ত। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তারা নতুন করে দাঁড়াবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। সারা বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে। এই সংকট থেকে নিজেদের পুনরুদ্ধার করতে বিশ্বে প্রায় সব দেশই আলোচনা শুরু করেছে। কোন খাতে কত ক্ষতি তা হিসাব করে অনেকেই কিছু পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিচ্ছে।

বাংলাদেশের অবস্থা কেমন? গত বছর পহেলা বৈশাখের বিশাল অংকের অর্থনৈতিক ক্ষতির পর রমজান, রোজার ঈদ এবং কোরবানীর ঈদের ক্ষতিও ছিল অপূরণীয়। এরই মধ্যে এই দুঃসহ একটি বছর অতিক্রম করেছে। বলা হচ্ছে, এখন এর দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। সামনে আবারো আসছে পহেলা বৈশাখ, রমজান এবং ঈদুল ফিতর। সামনের দিনগুলোতে দেশ কীভাবে এই ক্ষতিগুলো কাটিয়ে উঠবে সেটা সরকারসহ সকলকে ভাবিতে তুলেছে।

বিশ্বব্যাপী মানুষ ব্যয় কমাচ্ছে এবং ঘরে থাকছে। ডেনমার্কে ২৯% মানুষের ব্যয় কমেছে লকডাউনের সময়। সুইডেনের অবস্থাও একই রকম। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রকৃত প্রভাব টের পেতে সময় লাগবে। লকডাউন তোলার পর প্রকৃত ঘটনা ঘটতে থাকে। চীনে লকডাউন তোলার মাসখানেক পরে দেউলিয়া হওয়ার আবেদন বাড়তে থাকে। ইউরোপে প্রতি পাঁচজন কর্মীর মধ্যে একজন কর্মী বিশেষ স্কিমের আওতায় আছে, রাষ্ট্র তাদের মজুরি দিচ্ছে। সরকার এক সময় তা তুলে নিবে। তখন প্রকৃত অবস্থা বোঝা যাবে। বার্গার কিংয়ের মত রেস্তোরা বলছে, শূণ্য রেস্তোরা তারা ভাড়া দিতে পারবে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সব দেশের অবস্থাই এ রকম। কোন দেশ তা কীভাবে মোকাবিলা করবে সেটাই দেখার বিষয়।

এডিবি গত বছর বলেছে, “বাংলাদেশে ১৪-৩৭ লাখ মানুষ বেকার হবে। অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে ১৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি।” বিশ্বব্যাংক বলেছে, “করোনার প্রভাবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব পড়বে। উৎপাদন খাত বিশেষ করে রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকের চাহিদা বিশ্বব্যাপী কমে যাবে। আভ্যন্তরীণ উৎপাদন পণ্যের চাহিদা কমে যাবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ঝুঁকি তৈরি করবে। নগর দারিদ্র বাড়বে। পল্লী এলাকায় গরিবের সংখ্যা বাড়বে।” কিন্তু বিশ্বব্যাংকের এই ভবিষ্যৎ বাণী পুরোটা সত্যি হয়নি। বরং বলা যায়, সবাইকে অবাক করে বাংলাদেশের অর্থনীতি সামনে এগিয়ে চলছে। গত ২০১৯-২০২০ অর্থ বছরে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ ২,৭৯৪.৯১ কোটি ডলার আয় করেছে।

অবশ্য, বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে আশার কথাও জানা যায়। গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দেশে রেমিটেন্স আসা কমতে থাকলেও রোজার ঈদের আগে এপ্রিল মাস থেকে রেমিটেন্স বাড়তে শুরু করেছে বলে বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

আর কীভাবে বাংলাদেশ তার আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারে জানতে চাইলে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্ঠা এবং “পিপিআরসি”র নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, “কৃষিখাতও যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। গত বছর সাধারণ ছুটি এবং পরিবহন বন্ধ থাকায় দুগ্ধশিল্প, পোল্ট্রি, সবজি, লাইভস্টক সবকিছুই ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। রপ্তানি খাত এবং প্রবাসী আয়ে যে ক্ষতি হয়েছে তা অনেকটা পুনরুদ্ধার হচ্ছে। তবে কৃষির মাধ্যমে এ ক্ষতি অনেকাংশে পুষিয়ে নিতে হবে। আমাদের আভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে কৃষির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিতে মধ্যমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব। এজন্য সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে কৃষিক্ষেত্রে সার্বিকভাবে নীতিকৌশল প্রয়োগ করতে হবে।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝা যাবে আরো কিছু দিন পর। এখন যে দ্বিতীয় ঢেউ চলছে তা কতদিন ধরে চলবে তা বলা মুশকিল। তবে এর মধ্যে ঘটে যেতে পারে বহুকিছু। এ পরিস্থিতিতে কোন দিকে যাবে আমাদের অর্থনীতি, আগামীতে দেশ কীভাবে এ পরিস্থিতি মোকাবিলা করবে- এ রকম আরো বহু প্রশ্ন নিয়ে এ মুহুর্তে সকলেই তাকিয়ে আছেন ব্যবসায়ী, গবেষক-অভিজ্ঞজন এবং অর্থনীতিবিদের চিন্তাপ্রসূত কর্মপদ্ধতি কিংবা দিক নির্দেশনার দিকে। সর্বোপরি সরকারের কার্যকর নীতি-নির্ধারণের উপর।

এখন সবচেয়ে জরুরি করণীয় কি সেটা নির্ধারণ করা এবং সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া এবং তা বাস্তবায়ন করা। বিপুল পরিমাণ ক্ষতি, সরকারের দায়ভার এবং করণীয় কী বিষয়গুলো নিয়ে কথা হয় বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের সাথে। তিনি পুরো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে করণীয় বিষয়গুলোর প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বলেন, “আগে আগুন নেভাতে হবে। এরপর আমরা কি করবো তা ঠিক করতে হবে। আমরা এখনো আগুন নেভাতে পারিনি। তাই এ মুহুর্তে সেদিকে বেশি মনোযোগ দিতে হবে এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে করণীয় কাজগুলো কঠোর নজরদারির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।” করোনাভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অর্থনীতিকে সচল রাখতে চার ধরনের করণীয় বিষয়ের কথা তিনি বলেন।

১. স্বাস্থ্যখাতকে ঠিক করতে হবে: এতে অবকাঠামো থেকে শুরু করে লোকবল বাড়ানো, নমুনা পরীক্ষা, করোনাভাইরাসের জন্য প্রয়োজনীয় যা কিছু দরকার তার ব্যবস্থা করা। এর পাশাপাশি অন্য রোগ হলে তার চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে সরকারি এবং বেসরকারি পর্যায়ে যে ভুল-ত্রুটি, দুর্বলতা এবং অব্যস্থাপনা দেখেছি সেগুলো অ্যাডড্রেস করে নির্মূল করতে হবে এবং সকলেই সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

২. শ্রমিকদের ছাটাই না করা: বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে যারা কাজ করে তাদেরকে কর্মহীন করা যাবে না এবং শ্রমিকদের কাজের নিশ্চয়তা থাকতে হবে।

৩. প্রতিষ্ঠানগুলোকে টিকিয়ে রাখা: সব ধরনের প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখতে হবে। এক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকেও সমান মনোযোগ দিতে হবে। যারা সামাজিক খাতকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে সাহায্য করতে হবে। তারা গত বছর বিরাট লস করেছে। গত বছর পহেলা বৈশাখ, রমজান বা ঈদে যারা বিশাল বিনিয়োগ করেছিলো তা থেকে তারা কোনো ব্যবসা করতে পারেনি। এবারও হয়তো পারবে না। তাদেরকে সহযোগিতা করতে হবে। এসব ছোট-বড় প্রতিষ্ঠানগুলোকে যে কোনোভাবেই হোক সরকারকে টিকিয়ে রাখতে হবে। বড় প্রকিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে বলা যায়, তারা এমনিতেই ধনী এবং তারা টিকে যাবে।

৪. যারা ঝুঁকিতে আছে তাদেরকে সহায়তা করা: আমাদের দেশে হয়তো ৪ কোটি মানুষ দরিদ্র ছিলো, সেটা হয়তো এখন ৬ কোটিতে নেমে গেছে। হতদরিদ্রদের সংখ্যাও বেড়েছে। দেখা যাচ্ছে, অনেকেই প্রয়োজনীয় জিনিস কিনতে পারছে না। এমনকি খাবারও কিনতে পারছে না। কেউ কেউ বাড়ি ভাড়া দিতে পারছে না, চিকিৎসা করতে পারছে না। তাদেরকে অর্থ সহায়তা দিতে হবে। সরকারকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এদের মধ্যে যারা বিদেশে থাকে বা বিদেশে যাদের চাকুরি চলে গেছে কিংবা যারা বিদেশ থেকে বাড়িতে ফিরেছে কিন্তু হাতে টাকা নেই, তাদেরকেও প্রয়োজনে সাহায্য করতে হবে। এসব মানুষকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এনে বাঁচাতে হবে। আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি, প্রভাবশালী বা ক্ষমতাসীনরা অনেক অনিয়ম ও দুর্নীতি করেছে। সেটা যাতে না হয়, এজন্য যথেষ্ট নজরদারি থাকা দরকার।”

পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য ইতোমধ্যে সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। হাসপাতাল এবং নমুনা পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরির সংখ্যা বাড়িয়েছে। চিকিৎসক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা এবং প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে। দরিদ্রদের খাদ্য সহায়তা, অতি দরিদ্রদের নগদ সহায়তা এবং ক্ষতিগ্রস্থ ব্যবসায়ীদের সুদ সুবিধার জন্য ১ লাখ কোটি টাকার ছোট-বড় ১৯টি প্রণোদনা প্যাকেজ ব্যাংক খাতের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হলেও হলেও সরকারকে বড় একটি অংশ বহন করতে হচ্ছে। আগামী অর্থবছরও এই অর্থ দিয়ে যেতে হবে।

এ জন্য বিশাল অংকের অর্থ প্রয়োজন। সরকার কীভাবে এই অর্থ যোগাড় করবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থায়নের জন্য বাণিজ্যিক ব্যংকগুলোকে বেশি চাপ দেয়া ঠিক হবে না। এ ব্যাংকগুলো নিজেরাই বিপদে রয়েছে। ভালো হবে, কেন্দ্রীয় ব্যংক থেকে ঋণ নেয়া। মানুষের এখন চাহিদা কম। সুখবর হলো, বৈদেশিক ঋণ পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনুদানের জন্য চেষ্টা করতে হবে।

অর্থ সংগ্রহে রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কর আদায়ের দিকেও মনোযোগ দিতে বললেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা জনাব এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম।

প্রণোদনা ছাড়াও অর্থনৈতিক মন্দা রুখতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মো. জাফর উদ্দীন বলেন, “সব শ্রেণির মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কম মূল্যে চাল বিক্রি ছাড়াও সরকার টিসিবি ও ভোক্তা নিয়ন্ত্রণ-এর মাধ্যমে দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখার জন্য বিশেষভাবে নজরদারি করছে। রপ্তানি আয় বাড়ানোর জন্য সরকার সকল ধরনের আপত্তির মাঝে ঝুঁকি নিয়ে কল-কারখানা খুলে দিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্যে সচল রাখতে সহায়তা করেছে। এতে ইতিবাচক সাড়াও পাওয়া গেছে। গত জুলাইয়ে সর্বোচ্চ রপ্তানি আয় হয়েছে। এটা আমাদের বিরাট অর্জন।”

অর্থনীতির দুরবস্থা কাটাতে সঠিক পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়নের পাশাপাশি রাজস্ব আয় বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছেন বিশেষজ্ঞরা। এ জন্য সুপরিকল্পিতভাবে কাজ করার কথা বলছেন তারা। তাই কর আদায়, প্রশাসনিক খরচ কমানো, থোক বরাদ্দ বাতিল এবং কম প্রয়োজনীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা বাতিল করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published.