ভারতীয় মুসলিমদের কাছে ধর্মের আগে দেশ বড়!

ধর্ম পরে, ভারতীয় মুসলিমদের কাছে সবার আগে দেশ। অল ইন্ডিয়া ইমাম অরগানাইজেশনের (এআইইও) প্রধান ইমাম ড. ওমর আহমেদ ইলিয়াসি সম্প্রতি সংবাদমাধ্যম সিএনএন নিউজ১৮-তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘ধর্ম নয়, ভারতীয় মুসলিমদের কাছে দেশ সবার আগে।

ড. ওমর আহমেদ ইলিয়াসি সাক্ষাৎকারে বলেন-
প্রথমত : আমি এমন প্রশ্নে অবাক হই, যখন কেউ প্রশ্ন করে যে, আপনি ভারতীয় মুসলিম নাকি ভারতীয় খ্রিস্টান? এমন প্রশ্নে আমার সবচেয়ে বড় আপত্তি রয়েছে। কেননা আমার প্রথম পরিচয় হলো- আমরা ভারতীয়। ধর্ম ও বর্ণ আলাদা হতে পারে। ধর্মীয় ঐতিহ্য ও উপাসনার পদ্ধতিও আলাদা হতে পারে। তবে আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ ধর্ম হলো মানবতা এবং দ্বিতীয় ধর্ম ভারত, যদি আপনি ভারতে বাস করেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি একজন ভারতীয় এবং একজন ভারতীয় হিসেবে আমি গর্বিত। দয়া করে আমাকে ভারতের সঙ্গে যুক্ত করুন। আমি ভারতের প্রধান ইমাম, মুসলমানদের ইমাম নই। আমার প্রথম আপত্তি হচ্ছে আমাদের ধর্মের সঙ্গে যুক্ত করবেন না। আমাদের ভারত ও ভারতীয়তার সঙ্গে যুক্ত করুন। জাতি সবার ওপরে।’

ভারতের প্রধান ইমাম ড. ইলিয়াসি বলেন, ভারত বরাবরই বিশ্বগুরু। এটি আগেও ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। ভারত সব সময় অন্যকে আশ্রয় দেয়। ভারত সব সময় অন্যকে সাহায্য করে। আজ পর্যন্ত ভারত কোনো দেশকে আক্রমণ করেনি। কোনো দেশের কোনো অঞ্চলও দখল করেনি। এটি ভারতের জন্য অনন্য মর্যাদা এবং এটিই ভারতের পরিচয়।

তিনি আরও বলেন, ‘ভারত বিশেষ গতি নিয়ে এগিয়ে চলেছে। পুরো বিশ্ব ভারতের দিকে তাকিয়ে আছে। ভারতের বিজ্ঞানী ও গবেষকরা খুব অল্প সময়ে দিনরাত পরিশ্রমের মাধ্যমে ভ্যাকসিন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।

আজ পুরো বিশ্ব আমাদের কাছ থেকে ভ্যাকসিন প্রত্যাশা করছে। আমি শ্রীলঙ্কা থেকে টেলিফোন কল পাচ্ছি, বাংলাদেশ থেকেও; পুরো বিশ্ব ভ্যাকসিন সরবরাহের জন্য অনুরোধ করছে।
আজ আমরা এমন একটি অবস্থানে রয়েছি যে আমরা পুরো বিশ্বকে ভ্যাকসিন সরবরাহ করতে পারি। আজ ভারত পুরো বিশ্বের শীর্ষে অবস্থান করছে আর আমি আমার দেশ ভারতকে নিয়ে গর্বিত বলেও উল্লেখ করেন ড. ইলিয়াসি।
> ভারতীয় গবেষণা ও চিকিৎসা বিজ্ঞান সম্পর্কে গুজব আছে, এমন প্রশ্নে ড. ইলিয়াসি বলেন-
‘প্রতিটি সমাজে ভাল মানুষ আছে, খারাপ লোক আছে, এবং আমি অনুভব করি যে ভাল লোকদেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা বেশি। যারা দুষ্টামি করতে চায় তারা দুষ্টামি করবে এবং যারা মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চায় তারা বিভ্রান্ত করবে। বর্তমানে বেশিরভাগ মানুষ সুশিক্ষিত এবং তারা ভ্যাকসিন সম্পর্কে সমস্ত কিছু জানেন। গুজব ছড়িয়ে দিয়ে আপনি জনগণকে বিভ্রান্ত করতে পারবেন, আসলে বিষয়টি এমন নয়।
আমি আজ থেকে ২০ বছর আগে কথা বলছি, আপনার মনে থাকবে যে পোলিও ফোঁটা নিয়ে আমাকে খুব কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছিল। যখন পোলিও ড্রপ শুরু হয়েছিল। তখন কিছু লোক জনগণকে বিভ্রান্ত করেছিল যে দয়া করে এই পোলিও ফোঁটা খাবেন না এবং যদি আপনি সেগুলি গ্রহণ করেন তবে আপনার এমন এমন সমস্যা এবং রোগ হবে।

সে সময়ও আমি দেশটির প্রধান ইমাম হিসেবে এ গুজবের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে আমার বক্তব্য দিতে হয়েছিল। তেমনিভাবে চিকেনপক্সের সময়ও এটি হয়েছিল এবং সেই সময়ও কিছু লোক গুজব ছড়িয়েছিল।

তবে আমরা গর্বিত যে, ভারত ভ্যাকসিন তৈরি করেছে এবং বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ এখন ভারতকে এই ভ্যাকসিনের জন্য অনুরোধ করছে। আমি বরং আমাদের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদীজি কে অভিনন্দন জানাই যিনি নিজেও ভ্যাকসিন উত্পাদনকারী সংস্থাগুলির সঙ্গে দিনরাত অবিচ্ছিন্ন যোগাযোগে রেখেছিলেন। যাতে জনগণের সহযোগিতায় এবং সরকারের সহযোগিতায় ভ্যাকসিনগুলি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব পাওয়া যায়।

> ভারতে মুসলিমদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে দেশটির প্রধান ইমাম বলেন,
‘আমি একটি উদাহরণ দিতে চাই। খুব বেশি দূরে যাব না। আমি কেবল আমাদের প্রতিবেশি দেশ চীনকে দেখিয়ে বলব- চীনের মুসলমানদের ইবাদতের স্বাধীনতা নেই। চীনের মুসলিমরা টুপি পরতে পারে না। দাঁড়ি রাখতে পারে না। রমজানে রোজা রাখতে পারে না। তাদের কোনো ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনের স্বাধীনতা নেই।

আমাদের প্রতিবেশী দেশ নিজের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে গর্বিত। অন্যদিকে ভারতে সব ধর্মের মানুষকে সম্মান করা হয়। আমাদের দেশের বিশেষত্ব হলো অনেক ধরনের মানুষ মিলে মিশে একতাবদ্ধ জীবন যাপন করে।

আমরা একে অপরের উৎসব উদযাপন করি। আমাদের একে অপরের মধ্যে স্নেহ আছে, আমরা একে অপরের ধর্মীয় স্থানে যাই। হিন্দুরা মসজিদে যায়, মুসলমানরা মন্দিরে যায়। এটা অন্য কোনো দেশে কি ঘটে? আমি এর বেশি কিছু বলতে চাই না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমার পরিচয় ভারতের সঙ্গে। আমি যখন হজ করতে যাই এবং যখন আমি সৌদি আরবের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে চেক ইন করি এবং আমার পাসপোর্ট দেখি তখন অফিসার আমাকে আমার ধর্ম জিজ্ঞাসা করেন না।

তবে তিনি (ইমিগ্রেশন অফিসার) আমার দেশের নাম জিজ্ঞাসা করেন। আমার পরিচয় আমার দেশের সঙ্গে এবং তাই আমি বলি যে দয়া করে ভারতকে শক্তিশালী করুন, ভারতীয়ত্বকে শক্ত করুন। কেননা দেশ সবার উপরে।’

Leave a Reply

Your email address will not be published.