লম্বা চুলই কাল হলো ঝুমার

সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের সম্মান প্রথম বর্ষের ছাত্রী ঝুমা রাণী মজুমদার। মাথায় লম্বা চুল। এই চুলই হলো তার জীবনের কাল। ইজিবাইকের মোটরের সঙ্গে পেঁচিয়ে মাথার চামড়াসহ সব চুল উঠে গেছে। খুমেক হাসপাতালে এখন জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ঝুমা। উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন প্রচুর অর্থ। কিন্তু হতদরিদ্র পরিবারের পক্ষে তা সম্ভব নয়। এসব ভেবে হতভম্ভ দিনমজুর পিতা।

কালো লম্বা চুল নিয়ে পাড়া-পড়শী আর সহপাঠিরা রীতিমতো ঈর্ষা করতো তাকে। কখনো চুল ছেড়ে আবার কখনো বেণী করে ঝুমা যখন চলাফেরা করতো তখন সবাই অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতো তার দিকে। তখন কেউ ডেকে উঠতো কেশবরণ কন্যারে তোর মেঘবরণ চুল, আবার কেউ কেশবতী কন্যা বলে।

খুনাক্ষরে কেউ কি ভেবেছিলো এই লম্বা চুলের কারণে মৃত্যুর প্রহর গুনতে হবে তাকে। ঘটনাটি গত ৩ নভেম্বরের। লম্বা চুল বেণী করে প্রতিদিন কার মতো সকালে প্রথম বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা দিতে বাড়ি থেকে রওনা হয়। দুই কিলোমিটার দূরত্বের কলেজে যাওয়ার পথে সঙ্গী হয় আরো কয়জন সহপাঠী। চালকের পেছনের আসনে সহপাঠীদের মুখোমুখি বসা ছিলো ঝুমা।

ইজিবাইকটি আমতলা নামক স্থানে পৌঁছালে বেণী করা লম্বা চুল পেঁচিয়ে যায় ইজিবাইকের মোটরে। দ্রুত গতিতে চলা ইজিবাইকের টানে মুহূর্তে চুল ছিড়ে মাথার চামড়াসহ ওঠে যায়। তৎক্ষণাৎ সহপাঠীরা রক্তাক্ত অবস্থায় মাথায় ওড়না পেঁচিয়ে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। অবস্থার অবনতি দেখে আনা হয় খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতালে। বর্তমানে সেখানের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসারত ঝুমা।

খুমেক হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, কখনো চোখ বুঝে, কখনো ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে ঝুমা। গোটা মাথায় ব্যান্ডেজ। শুতে পারে না, বলতে পারে না কথা। চোখে মুখে বাঁচার করুণ আকুতি। বালিশে মাথা দিয়ে শুতে পারে না। তাই বসেই তাকে ঘুমোতে হয়। মাঝে মাঝে প্রচণ্ড ব্যাথায় চিৎকার ভারি হয়ে ওঠে হাসপাতালের পরিবেশ।

জানা যায়, ঝুমা তালা উপজেলার রাড়ীপাড়া গ্রামের নেপাল মজুমদারের মেয়ে। তিন বোনের মধ্যে সে বড়। তেরো বছরের মেঝ বোন বাক ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী। আর ছোট বোনের বয়স তিন বছর। ২০১৯ সালে কুমিরা মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে। এরপর এইচএসসি পাস করে পাটকেলঘাটা থানার কুমিরা মহিলা ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০২১ সালে। একই কলেজে ভর্তি হয় সম্মান শ্রেণিতে সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে। বাবা দিন ভিত্তিতে অন্যের পানের বরজে কাজ করেন। স্ত্রী সন্তনদের নিয়ে কোন রকমে মাথা গুজে থাকে পৈত্রিক ভিটেতে।

এমন পরিস্থিতিতে পরিবারে পাশে দাঁড়িয়েছেন ঝুমার শিক্ষক নারায়ন চন্দ্র মজুমদার। তিনি বলেন, এই পরিবারের পক্ষে কোন ভাবেই তার চিকিৎসা করানো সম্ভব নয়। এজন্য সরকার কিংবা বিত্তবানদেন এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই হয়ত একটি পরিবার বাঁচবে। তিনি আরও বলেন, এমন দুর্ঘটনার অভূতপূর্ব না হলেও হয়ত একেবারেই বিরল। একমাত্র অর্থের বিনিময়ে সুচিকিৎসা আর সৃষ্টিকর্তার কৃপা ছাড়া ঝুমার বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

ঝুমার মা রক্তিমা মজুমদার জানান, বড় মেয়েই বাবার স্বপ্ন। পড়ালেখা শিখে চাকরি করে প্রতিবন্ধী বোনকে দেখবে। ছোট বোনকে শিক্ষিত বানাবে। বাবার কষ্ট দূর করবে। কিন্তু এখন সেই আমাদের দুশ্চিন্তার কারণ। তাই আমাদের মেয়েকে বাঁচাতে আমরা সকলের সহযোগিতা চাই।

খুমেক হাসপাতালে বার্ন অ্যান্ড প্ল্যাস্টিক সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. মো. তরিকুল ইসলাম জানান, মাথার চামড়ার ৭০ শতাংশ উঠে গেছে। এখন তাকে প্রতিদিন ড্রেসিং করা ও নিয়মিত ওষুধ দেয়া হচ্ছে। অবস্থা একটু ভালো হলে পা থেকে মাংস কেটে প্লাস্টিক সার্জারীর মাধ্যমে মাথায় দিতে হবে। তারপর কসমেটিক সার্জারী। সবশেষে চুল বসানো কাজ। তবে খানিকটা ভালো হলে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা কিংবা বাইরে নিতে হবে।

Leave a Comment