আখের রস বিক্রি করে ছেলেকে আইনজীবী বানালেন বাবা

বাবা-মায়ের কাছে সন্তানই অমূল্য ধন। সন্তানের জন্য শেষ সম্বলটুকু উজাড় করে দিতেও দ্বিধা করেন না তারা। বটবৃক্ষ হয়ে সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করতে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যান। তাদের সংগ্রামের কারণেই সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হন। পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব কাঁধে

নেন। প্রত্যেক সন্তানের সফলতার পেছনে রয়েছেন মা অথবা বাবা কিংবা মা-বাবা দুজনেরই অবদান। তবে কখনও কখনও সন্তানের কাছে হিরো হয়ে যান বাবারা। তেমনই একজন বাবা ৬৫ বছরের মোস্তাক মিয়া। যিনি আখের রস বিক্রি করে ছেলেকে লেখাপড়া করিয়েছেন। তার সেই ছেলে আজ আইনজীবী।

মোস্তাক মিয়া কুমিল্লা আদর্শ সদরের চানপুর বন্দিশাহ মসজিদ এলাকার বাসিন্দা। জীবনের অর্ধেকের বেশি সময় কাটিয়েছেন আখের রস বিক্রি করে। তার দাবি, কুমিল্লা অঞ্চলে প্রথম তিনিই আখের রস বিক্রি শুরু করেন। সারাদিন আখের রস বিক্রি করে যা পান তা দিয়েই চলছে সংসার। অভাব-অনটনের মাঝেও তিন ছেলের লেখাপড়ার প্রতি ছিলেন সচেতন।

কুমিল্লার প্রাণকেন্দ্র কান্দিরপাড়ের টাউন হল মাঠের এক পাশে প্রতিদিনই আখের রস বিক্রি করতে দেখা যায় মোস্তাক মিয়াকে। মেশিনে আখ চিবিয়ে রস বিক্রি করেন। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করছেন ভাতিজা মোক্তার আলী। তিনি চাচার ব্যস্ত সময়ে আখ থেকে ছোলা ছাড়ান। মাঝে মাঝে ক্রেতাদের কাছ থেকে টাকা নেন। সন্ধ্যায় চাচা-ভাতিজা একসঙ্গে বাড়ি ফেরেন।

মোস্তাক-৩
অভাব-অনটনের মাঝেও তিন ছেলের লেখাপড়ার প্রতি সচেতন ছিলেন মোস্তাক মিয়া
মোস্তাক মিয়ার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আখ চিবানোর বর্তমান এই মেশিন আগে ছিল না। তখন হাতে চাকা ঘুরিয়ে আখ চিবিয়ে রাস্তায় ঘুরে ঘুরে রস বিক্রি করতেন। ভ্যানগাড়ি টেনে এলাকার পর এলাকা ঘুরে আখের রস বিক্রি করতেন। দিনে ভালোই আয় হতো। এ আয়েই চলতো সংসার আর তিন সন্তানের পড়াশোনা।

কথা বলার একপর্যায়ে মোস্তাক মিয়া আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, ‘বাবারে, আঁই পড়াশোনা বেশি করি নাই। কিন্তু আঁর পোলা কুমিল্লা কোর্টের উকিল। অনার্স-মাস্টার্স শেষে এলএলবি কইরা উকিল হইছে। মেজো ছেলে বিদেশে। ছোট ছেলে আমার সঙ্গে বাড়িতে থাকে।’জীবন সংগ্রামের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দিনে আয় করতাম রাইতে খাবার কিনতাম। তা দিয়ে চলতো। তবে পোলাগুলারে মানুষ করুম এইডাই ছিল স্বপ্ন। দেখলাম বড় পোলাডা পড়তে আগ্রহী। নিজের ঘাম ঝরানো পয়সা দিয়া তারে লেখাপড়া করাইছি।

এমনও দিন গেছে পোলা কিছু আবদার করছে, নীরবে চোখের পানি ফেলেছি। কিন্তু তারে কিছু দিতে পারি নাই। এসব কথা এখনও মাঝেমধ্যে মনে হয়। তখন মনে এই ভেবে আনন্দ লাগে, পোলা এখন নিজের আবদার নিজেই মিটায়। এই আনন্দের কথা প্রকাশ করা যায় না। আরও কত ঘটনা আছে এই জীবনে। তবে কোনও কিছুই আমার পোলা ভুলে নাই। পোলাও আমার লগে আখের রস বিক্রি করতো। এখন পোলা আইনজীবী। আমার কিচ্ছু চাওয়ার নাই। তবে দুঃখ মেজো আর ছোট ছেলেরে পড়ালেখার জন্য চেষ্টা করেও পারি নাই। মেজো ছেলে মেট্রিক (এসএসসি) পরীক্ষা দেওয়ার পর আর পড়ালেখা করবে না বলে জানায়। চেষ্টা করে দেখলাম কাজ হবে না। পরে পাঠাই দিলাম বিদেশ। এখন ভালোই আছে।’

মোস্তাক-২
কখনও সন্তানের কাছে হিরো হয়ে যান বাবারা, মোস্তাক মিয়া তেমনই এক বাবা
মোস্তাক মিয়ার আইনজীবী ছেলে মো. জাফর আলী বলেন, ‘বাবা আমার আইডল। প্রাথমিকের পড়াশোনা শেষ করে কুমিল্লা হাইস্কুলে ভর্তি হই। সেখানে শেষ করি মাধ্যমিক। পরে ভর্তি হই রিলায়েন্স বহুমুখী হাইস্কুলে। সেখানে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করি। পরে পরীক্ষা দিই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে। ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইসলামের ইতিহাস বিভাগে পড়াশোনা শুরু করি। যেহেতু বাবার সঙ্গে থাকায় চাকরির পড়াশোনা তেমন করা হয়নি, তাই চাকরির দিকে আর ঝুঁকতে পারিনি। ভর্তি হই আইন কলেজে। তখনও আমি বাবার সঙ্গে কাজ করি। পাশাপাশি কুমিল্লা আইন কলেজে ক্লাস করতে থাকি।’

‘২০১৩ সালে আমার আইন পড়া শেষ হয়। এরপর কুমিল্লা কোর্টে প্র্যাক্টিস করতে যাই। ওই বছরই বাবা আমাকে বলেন, যেহেতু আমি কোর্টে যাই আমার আর দোকানে আসা লাগবে না। বাবার কথায় আমি দোকানে আসা যাওয়া কমিয়ে দিই। কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে এখনও আমি বাবার আখের রসের দোকানে যাই। বাবার দোকানে আখের জোগান কমে গেলে আমি পাইকারি বাজার থেকে আখ এনে দিই। এতে কখনও লজ্জাবোধ করিনি।’

জাফর আলী আরও বলেন, ‘আমার জীবনে অনেক স্মৃতি আছে। সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে বন্ধুদের কথা। বাবার পর তারাই আমার অনুপ্রেরণা। আমার বাবা আখের রস বিক্রেতা তারা আমাকে কখনই বুঝতে দেয়নি। ২০০৬ থেকে ২০১৩ সাল। আমি বাবার সবচেয়ে বড় সহযোগী ছিলাম। অনেকে এটা সেটা বলতো। কারও কথার গুরুত্ব দিইনি। তিনি আমার বাবা এটা পরিচয় দিতে আমার কখনও লজ্জা লাগে না। আমি গর্ববোধ করি।

বাবা আখের রস বিক্রি করে আমাকে আইনজীবী বানাতে পারলে আমি কেন তার পরিচয় দিতে পারবো না? আমার বাবা আমার কাছে একজন হিরো। আমি বিশ্বাস করি অর্থ সম্পদ কোনও বিষয় নয়। পড়াশোনা একান্তই নিজের ও পরিবারের ইচ্ছে। সব বাবাই চান ছেলেমেয়ে বড় হোক, যেন বাবাদের ছাড়িয়ে যায়।’